হালুয়াঘাট প্রতিনিধি ঃ মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায় ৩ নভেম্বর-ঐতিহাসিক তেলিখালি যুদ্ধ। হালুয়াঘাটে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘ঐতিহাসিক তেলিখালী যুদ্ধ দিবস’ পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে মঙ্গলবার দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে উপজেলা প্রশাসন।
অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল মহান শহীদদের কবরে পুস্পমাল্য অর্পণ, কবর জেয়ারত ও দোয়া মাহফিল, ‘ঐতিহাসিক তেলিখালী দিবসে’র তাৎপর্য শীর্ষক স্মৃতিচারণ সভা।
১৯৭১ সালের এই দিনে তেলিখালি রণাঙ্গন পরিণত হয়েছিল এক রক্তাক্ত প্রান্তরে। ভারতীয় সীমান্তবর্তী তেলিখালি ক্যাম্প পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দখলমুক্ত করতে ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা যৌথভাবে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। টানা পাঁচ ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে যৌথবাহিনীর কাছে পরাজিত হয় পাকিস্তানি সেনারা। যুদ্ধে ১২৪ জন পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের শতাধিক সহযোগী রাজাকার ও আলবদরসহ মোট ২৩৪ জন নিহত হয় বলে স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। এই বিজয়ের জন্য চরম মূল্য দিতে হয় যৌথবাহিনীকে। যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর ২১ জন জওয়ান এবং সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
তেলিখালির যুদ্ধে শহীদ সাত বীর মুক্তিযোদ্ধা হলেনÑসরিষাবাড়ীর শওকত আলী, হালুয়াঘাটের মো. আক্তার হোসেন, ফুলপুরের মো. হযরত আলী, ময়মনসিংহ সদরের মো. আলাউদ্দিন, মো. শাহজাহান, শ্রী রঞ্জিত গুপ্ত এবং নোয়াখালীর মো. ওয়াজি উল্লাহ।
ঐতিহাসিক এই যুদ্ধের বিজয় শুধু তেলিখালি অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় অভিযানে নতুন গতি সঞ্চার করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের পথে এটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রযাত্রা।
দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান, জেলা ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মীর্জা নজরুল ইসলাম বেগ, সদস্যসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক মন্ডল, হালুয়াঘাট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কাজীম উদ্দিন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম আমজদ আলী প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাকিয়া সুলতানা রোজি।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, তেলিখালির যুদ্ধ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সাহসিকতা, বীরত্ব ও আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই যুদ্ধে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ এবং অসীম সাহসিকতা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তুলে ধরা এবং শহীদদের অবদান যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সবার দায়িত্ব।
বক্তারা ঐতিহাসিক তেলিখালি যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান সংরক্ষণ, শহীদদের স্মরণে প্রয়োজনীয় স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন এবং যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।

0 Comments