হালুয়াঘাট প্রতিনিধিঃ ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে জমি বিক্রির পর একই জমি পুনরায় হেবা ঘোষণার মাধ্যমে অন্যত্র রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে বীরগুছিনা গ্রামের মৃত আব্দুল মান্নাফের কন্যা মোছাঃ বকুল জান বিবির বিরোদ্ধে। ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে একটি সাধারণ ভূমি বিরোধ হিসেবে শুরু হলেও অনুসন্ধানে উঠে আসছে পরিকল্পিত প্রতারণা, আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার এবং ভুক্তভোগীকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের গুরুতর অভিযোগ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, হালুয়াঘাট উপজেলার ধারা ইউনিয়নের বীরগুছিনা গ্রামের মৃত আব্দুল মান্নাফের কন্যা মোছাঃ বকুল জান বিবি গত ২৫ অক্টোবর ২০২২ ইং তারিখে ৮ লক্ষ ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে সাব-কাবলা রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে একই গ্রামের হায়দর আলীর পুত্র মোঃ মিজানুর রহমানের নিকট মোট ২০ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। সংশ্লিষ্ট ৭০৮০ নং দলিল অনুযায়ী জমিগুলো বীরগুছিনা মৌজার বি.আর.এস খতিয়ান নং ১৫৮-এর অন্তর্ভূক্ত এবং দাগভিত্তিকভাবে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত।
দলিল রেজিস্ট্রির মাধ্যমে জমি বিক্রির পর সাধারণত বিক্রেতার আর কোনো মালিকানা বা হস্তান্তরের সুযোগ থাকে না। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে আসে, বিক্রির মাত্র ২৮ দিনের মাথায়, অর্থাৎ ২২ নভেম্বর ২০২২ ইং তারিখে বকুল জান বিবি একই জমি তার দুই ভাই শরাফ উদ্দিন ও রিয়াজ উদ্দিনের নিকট ৭৬৩৫ নং দলিলের মাধ্যমে হেবা ঘোষণার নামে রেজিস্ট্রি করে দেন। আইন অনুযায়ী যে জমি ইতোমধ্যে বিক্রি ও হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে, সেই জমি পুনরায় হেবা ঘোষণা করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ।
এ ঘটনার পর জমির বৈধ মালিক ও দখলদার মোঃ মিজানুর রহমান বাধার সম্মুখীন হন। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে, যখন বকুল জান বিবি নিজেই মিজানুর রহমানের ক্রয়কৃত দলিল বাতিলের দাবিতে ময়মনসিংহের বিজ্ঞ সহকারী জজ হালুয়াঘাট আদালতে মামলা দায়ের করেন যাহার নং ২৯/২০২৩। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
ভুক্তভোগী মোঃ মিজানুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, “আমি বৈধভাবে জমি কিনেছি, রেজিস্ট্রি করেছি, টাকা পরিশোধ করেছি। অথচ একই জমি আবার হেবা দেখিয়ে অন্যদের নামে নেওয়া হয়েছে। এখন আমাকে চাপ দেওয়া হচ্ছে জমি ছেড়ে দিতে। আমি রাজি না হওয়ায় আমাকে খুন করার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। এটি শুধু জমির বিষয় নয়, এটি আমার জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্ন।”
এ বিষয়ে মানবাধিকার কর্মী জাতীয় ভূক্তা অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের চেয়ারম্যান মোঃ রিয়াজ উদ্দিন রানা বলেন, “এই ঘটনা নিছক পারিবারিক বিরোধ নয়। এখানে জমি বিক্রির পর পুনরায় হেবা ঘোষণার মাধ্যমে আইনের অপব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। একজন নাগরিকের সম্পত্তির অধিকার ক্ষুণœ হওয়ার পাশাপাশি তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। তিনি মনে করেন, এ ধরনের ঘটনায় দ্রæত প্রশাসনিক তদন্ত ও ভূক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষ ভূমি লেনদেনে চরম অনিশ্চয়তায় পড়বে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার উদ্দেশ্যে বকুল জান বিবির বাসায় একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এলাকাবাসীর দাবি, সংশ্লিষ্ট দলিল, রেজিস্ট্রি প্রক্রিয়া এবং হেবা ঘোষণার বৈধতা খতিয়ে দেখতে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী মিজানুর রহমান ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহŸান জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া না গেলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এ ঘটনাটি নিছক একটি ব্যক্তিগত জমি বিরোধে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি ভূমি ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতার ঘাটতি, রেজিস্ট্রি কার্যক্রমের স্বচ্ছতা এবং একই জমি একাধিকবার রেজিস্ট্রি হওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন হয়েছে কি না তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে বিষয়টি প্রশাসনিক তদারকি ও তদন্তের দাবি জানান অনেকেই।
0 Comments